ঢাকা, সোমবার ১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪৩২, ০৯ জমাদিউস সানি ১৪৪৭ | এখন সময়:

Advertise@01680 34 27 34

তরুণকে পিটিয়ে হত্যা - ‘আমার পোলারে খুন করার অধিকার তারারে দিসে কেডা’


অনলাইন ডেস্কঃ

প্রকাশিত:   ১০:০৮ পিএম, শুক্রবার, ২২ আগস্ট ২০২৫   আপডেট:   ১০:০৮ পিএম, শুক্রবার, ২২ আগস্ট ২০২৫  
তরুণকে পিটিয়ে হত্যা - ‘আমার পোলারে খুন করার অধিকার তারারে দিসে কেডা’
তরুণকে পিটিয়ে হত্যা - ‘আমার পোলারে খুন করার অধিকার তারারে দিসে কেডা’

শুক্রবার দুপুর ১২টা। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের সামনে ছেলের লাশের জন্য বাবা আমিনুল ইসলামের অপেক্ষা। ভেতরে চলছে ছেলের মরদেহের ময়নাতদন্ত। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কুমিল্লা নগরের অশোকতলা বিসিক শিল্পনগরী এলাকার একটি কারখানায় চাঁদাবাজির অভিযোগে হাত–পা বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করা হয় আমিনুলের ছেলে মোহাম্মদ সায়েমকে (২৪)।

ছেলের জন্য একটু পরপরই কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন আমিনুল। একপর্যায়ে এই প্রতিবেদককে তিনি বলে উঠলেন, ‘আমার পোলায় যদি অন্যায় করে তারে জেলে দিত। দরকার হইলে একটা হাত ভাইঙা দিত। কিন্তু আমার পোলারে খুন করার অধিকার তারারে দিসে কেডা? আরেকজনের বুকের ধন তারা কেমনে কাইড়া নিল। আমি খুনিরার বিচার চাই।’

আমিনুল ইসলাম একজন রিকশাচালক। তাঁর বাড়ি রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার সনাতন গ্রামে। ১৯৯৮ সালে কুমিল্লা নগরে আসেন তিনি। তিনি থাকেন কুমিল্লা শহরতলির দিদার মার্কেট এলাকায়।

আমিনুলের স্ত্রী রহিমা বেগম প্রায় দুই বছর আগে মারা গেছেন। তিন ছেলে, দুই মেয়ের মধ্যে এক মেয়ে ও দুই ছেলের বিয়ে হয়েছে। তাঁরা আলাদা থাকেন। ১১ বছর বয়সী ছোট মেয়ে আফসানা আক্তার আর সায়েমকে নিয়েই আমিনুলের সংসার। সায়েম নগরের একটি মাদ্রাসায় নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। মায়ের মৃত্যুর পর পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়েন। এরপর বখাটেদের সঙ্গে চলাফেরা শুরু হয় তাঁর।

সায়েমকে হত্যার পর বৃহস্পতিবার রাতেই তাঁর বাবা আমিনুল ইসলাম কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা করেছেন। মামলায় ৪৫ থেকে ৫০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। আজ বেলা দুইটা পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

এ বিষয়ে কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সাইফুল মালিক জানান, ‘আমরা ঘটনাস্থলে কোনো সিসিটিভি ফুটেজ পাইনি। তবে আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করার চেষ্টা করছি। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, নিহত সায়েম এলাকায় চাঁদাবাজি ছিনতাই করতেন। তাঁর বিরুদ্ধে একটি হত্যাসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের তিনটি মামলা রয়েছে। এ ঘটনায় এখনো কাউকে আটক বা গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।’ তিনি বলেন, এভাবে আইন হাতে তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। যাঁরাই এ ঘটনায় জড়িত, তাঁদের আইনের আওতায় আনা হবে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, সায়েম বিসিক, অশোকতলা এলাকায় চাঁদাবাজি করতেন। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে কয়েক দিন ধরে ক্ষোভ বিরাজ করছিল। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিসিক শিল্পনগরীর জান্নাতুল ফুড প্রোডাক্টস নামে একটি কারখানায় উৎপাদিত শনপাপড়ি খেতে গিয়ে সেখানে চাঁদা দাবি করেন সায়েম। এ সময় সেখানে হাত-পা বেঁধে তাঁকে আটকে মারধর করেন একদল লোক। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

তবে সায়েমের বাবা আমিনুল ইসলামের দাবি, তাঁর ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে খুন করা হয়েছে। তিনি বাংলারসময়ডটকম কে বলেন, ‘আমার ছেলেটা খারাপ ছিল না। তার মায়ের মৃত্যুর পর এলাকার কিছু খারাপ ছেলের সঙ্গে কয়েক দিন মেশার কারণে মানুষ তাকে খারাপ বলতে শুরু করে। আমার বাড়ি রংপুর, এ জন্য কিছু হলেই আমার ছেলেকে ফাঁসানো হতো। আমার ছেলেকে মামলা দিয়েও ফাঁসানো হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ঘটনার সময় তাঁর ছেলে কোনো চাঁদাবাজি করতে যাননি।

বিসিক শিল্পনগরীতে চারতলা একটি ভবনের নিচতলায় থাকা জান্নাতুল ফুড প্রোডাক্টস। আজ শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, ভবনটি তালাবন্ধ। ভবনের ওপরের তলায় যাঁরা ভাড়া থাকেন, তাঁরাও ভেতরে যেতে পারছেন না। তবে জানালায় দাঁড়ালে কারখানাটির মেঝেতে রক্তের ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায়। ভবনের সামনে একটি সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙা অবস্থায় মাটিতে পড়ে আছে। ওপর দিকে আরেকটি ক্যামেরা থাকলেও সেটির মুখ উল্টো করে দেয়ালের দিকে ফিরিয়ে রাখা।

জান্নাতুল ফুড প্রোডাক্টসের মালিক সাইফুল ইসলামের দাবি, ঘটনার সময় তিনি ঢাকায় ছিলেন। ঘটনার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি মুঠোফোনে বলেন, ‘তিন মাসের বেশি সময় ধরে আমাদের সঙ্গে বিভিন্নভাবে ঝামেলা করছে সায়েম। কখনো মানুষের মোবাইল ছিনতাই করে নিয়ে যায়। এখনো এসে সরাসরি চাঁদা চায়। চাঁদা না দিলে ক্ষতি করার হুমকি দেয়।’

সাইফুল আরও বলেন, ‘ঘটনার আগের দিন বুধবার দিবাগত রাত দেড়টার দিকেও সে (সায়েম) আমাদের কারখানায় আসে চাঁদার জন্য। তখন আমাদের দুজন স্টাফকে মারধর করে। এরপর বৃহস্পতিবার ঘটনার সময় ছুরি হাতে এসে কারিগরদের আঘাত করার চেষ্টা করে। তখন কয়েকজন কারিগর জীবন বাঁচাতে তাঁকে ঘেরাও করে মারধর করে। পরে ঘটনার খবর পেয়ে লোকজন এসে গণপিটুনি দিলে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে শুনেছি। ঘটনার পর তার সঙ্গী চাঁদাবাজেরা সিসিটিভি ক্যামেরা ভেঙে নিয়ে গেছে। না হলে দেখাতে পারতাম আমাদের ওপর কত অত্যাচার হয়েছে।’

অপরাধ থেকে আরও পড়ুন

চট্টগ্রাম বিভাগ কুমিল্লা খুন হত্যা

আপনার মন্তব্য লিখুন...