ঢাকা, শুক্রবার ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩, ২৮ শাওয়াল ১৪৪৭ | এখন সময়:

Advertise@01680 34 27 34

করোনা পরবর্তী সময়ে পুলিশের দায়িত্ব ও কর্তব্য


অনলাইন ডেস্কঃ

প্রকাশিত:   ০৩:০৭ পিএম, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২০   আপডেট:   ০৩:০৭ পিএম, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২০  
করোনা পরবর্তী সময়ে পুলিশের দায়িত্ব ও কর্তব্য
করোনা পরবর্তী সময়ে পুলিশের দায়িত্ব ও কর্তব্য

যাকে ভালোবাসি, তাকে স্বীকৃতি দিতে বাধে না। আবার যার সঙ্গে ভালোবাসা হতে হবে, তার মনে আপনার জন্য ভালো লাগাও তৈরি হতে হয়। ভালো লাগা বা না লাগার অনুভূতি সৃষ্টির জন্য আবার প্রয়োজন যোগাযোগের সুযোগ। এই যোগাযোগের কোয়ালিটি, ফ্রিকোয়েন্সি ও ভলিউমের ওপর নির্ভর করে কারও সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কতটা ভালো বা খারাপ হবে। কোনো পক্ষের সঙ্গে খারাপ মানের মিথস্ক্রিয়া বা ইন্টারঅ্যাকশন ফ্রিকোয়েন্সি ও ভলিউম যত বেশি হবে, তার বা তাদের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক তত খারাপ হবে।

একইভাবে যোগাযোগের মান উন্নত ও ইতিবাচক হলে প্রতি ইউনিট ইন্টারঅ্যাকশনে আপনার প্রতি অপর পক্ষের ধারণা ইতিবাচক হতে থাকবে। তৈরি হতে থাকবে ভালো লাগা। একসময় এই ইন্টারঅ্যাকশনের তীব্রতায় ভালো লাগাও হবে সুতীব্র। তৈরি হবে ভালোবাসা ও প্রেম। সেবাগ্রহীতার কাছে সেবাদাতা পাবে স্বীকৃতি। এই স্থানিক বা বিশেষ অবস্থাকেন্দ্রিক স্বীকৃতিও শেষ কথা নয়। কোনো একটি নির্দিষ্ট মানসম্মত ইন্টারঅ্যাকশন একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে চলমান থাকলে ধাপে ধাপে তা ভালো লাগা, গ্রহণযোগ্যতা, ভালোবাসা ও স্বীকৃতির পর্যায়ক্রমিক স্তর পেরিয়ে একটি স্থিতিশীল অবস্থার দিকে যেতে থাকে।

জনগণ যখন সেবাগ্রহীতা এবং পুলিশ যখন সেবক, তখনো বিষয়টি একই রকম দাঁড়ায়। যেহেতু রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় সাধারণ মানুষ ও জনগণের সঙ্গে পুলিশের মিথস্ক্রিয়া অনেক বেশি পরিব্যাপ্ত ও ব্যাপক, তাই পুলিশের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ভালো বা খারাপ হওয়ার সুযোগ বা সম্ভাবনাও অন্য যেকারও থেকে বেশি। প্রিয় ও অপ্রিয় উভয় সম্ভাষণেই অলংকৃত হওয়ার তাপ ও তোপের মুখেই অবস্থান পুলিশের। পুলিশ খারাপ কাজ ও বার্তা নিয়ে যত বেশিবার মানুষের কাছে যাবে, ততই বেশি হবে তার প্রতি মানুষের খারাপ ধারণা। এই ধারণা বদ্ধমূল হতে হতে একসময় তীব্র ঘৃণায় রূপান্তরিত হয়। এই ঘৃণার পরবর্তী রূপ হিসেবে ভুক্তভোগীরা পুলিশকে প্রতিপক্ষ মনে করতে শুরু করে। এটি হচ্ছে সম্পর্কের নেতিবাচক দিকের সর্বোচ্চ স্তর। বিশেষ কোনো দৈব পরিস্থিতি বা পুনঃপরীক্ষার সুযোগ সৃষ্টি না হলে এখান থেকে ফিরে আসা খুব সহজ নয়।

যারে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা—পুলিশের দশাও হয় ঠিক তেমনই। এমন পরিস্থিতিতে একটা সময় পুলিশের যেকোনো ভালো কাজও মানুষের মনে সন্দেহ জাগায়। পুলিশের ব্যক্তিগত কোনো অর্জন বা সুখের গল্প মানুষকে বিরক্ত করে, ঈর্ষান্বিত করে। পুলিশ সম্পর্কে বহু বছরের সঞ্চিত ভাবনা ও অনুভূতির যৌগ এই পরিস্থিতি। এর দায় কোনো পুলিশ কর্মকর্তার একার নয়। আবার এই অচলায়তন তৈরিতে পুলিশই একমাত্র পক্ষ নয়। যা-ই হোক, করোনা মহামারির আগে নেতিবাচক এই উচ্চতায় পৌঁছে পুলিশও হাঁপিয়ে উঠেছিল। হয়তো নিজেদের অজান্তেই অপেক্ষা করছিল একটি সুযোগের। খুব প্রয়োজন ছিল দেশ ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের স্বরূপ পুনরুদ্ধারের। একাত্তরে ২৫ মার্চের ডায়েরিটা পুনরায় মেলে ধরে নতুন একটি অধ্যায় যোগ করা ছিল সময়ের দাবি।

করোনাও এল। এল সহসাই। এল পৃথিবী ও বাংলাদেশের মানুষের সামনে এক চরম দুর্দিন। গুটিয়ে নিল মানুষ নিজেকে। নিল প্রয়োজনেই। নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল পুলিশ সদস্যদেরও। তাঁদেরও রয়েছে প্রিয় স্বজন। তাঁদেরও ঘরে রয়েছে ফুটফুটে মানবশিশু। রয়েছেন বৃদ্ধা মা ও বাবা। পথ চেয়ে থাকা পুলিশের সহধর্মিণীরা পথ চেয়েই কাটাচ্ছেন অভিশপ্ত এই করোনাকাল। পুলিশ গুটিয়ে যায়নি। জোর করেই ভুলতে হয়েছে এই করোনাকালে, ‘গুটিয়ে নেওয়াই সুখ’। দেশ ও মানুষের প্রতি যে দায়বদ্ধতা, সময়ের যে দাবি, তার যোগ্য মূল্য দিতে মোটেও কার্পণ্য করেননি পুলিশের দেশপ্রেমিক সদস্যরা। আগুন জেনেও ঝাঁপ দিয়েছেন। প্রাণ বাজি রেখে মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের দুই লক্ষাধিক সদস্য। এরই মধ্যে ২৩ জুলাই পর্যন্ত দেশ ও মানুষের জন্য আত্মোৎসর্গ করেছেন ৫৯ জন পুলিশ সদস্য। এই সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। তাঁদের এই ত্যাগের তাপে গলতে শুরু করেছে জনমনে দীর্ঘদিন ধরে জমাট বাধা ঘৃণা ও অস্বীকৃতি। মানুষও বুকে টেনে নিতে চাইছে পুলিশকে। দীর্ঘকালের সঞ্চিত মরচে সরে গিয়ে সবে পুলিশের শৌকর্যের মোহনীয় ইনসিগনিয়ার প্রকৃত রং ফুটতে শুরু করেছে বা ফুটেছেও অনেকটা। একই সঙ্গে নদীর ওপারেও বালুচরে জেগে উঠেছে কিছু; একটি আশঙ্কা।

ভাবমূর্তির মখমল কৌটায় করোনাকালে স্বীকৃতির সবচেয়ে বেশি মুক্তদানা সঞ্চয় করেছে পুলিশই; রয়েছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীসহ অন্যরাও। পুলিশের একটি কমন ও দৃশ্যমান ইউনিফর্ম রয়েছে। রয়েছে ‘পুলিশ’ কমন নামটি। করোনাকালে মাঠপর্যায়ে কর্মরত কোনো কোনো সংস্থা বা পক্ষ নানা নাম ও পরিচয়ে মানুষের কাছে পরিচিত। একই উৎস থেকে জাত হওয়া সত্ত্বেও মানুষ তাদের অগণিত ভিন্ন ভিন্ন পেশার নামকে এক সুতায় গেঁথে একটি মৌলিক পরিচয় হিসেবে দাঁড় করাতে পারেনি। সাধারণ কোনো শনাক্তকরণ চিহ্ন না থাকায় তাদের ব্যক্তিগত বা টুকরো টুকরো অর্জন কোনো এক বিশেষ নামের অধীনে সমন্বিত হতে পারেনি। অন্যদিকে, ইউনিফর্মিটি ও সহজ দৃশ্যমানতার কারণে প্রত্যন্ত কোনো অঞ্চলেও পুলিশের কোনো এক সদস্যের একক কোনো ভালো কাজের হাদিয়া সহজেই জমা হয়েছে বাংলাদেশ পুলিশের কেন্দ্রীয় ভাবমূর্তির ভান্ডারে।

অবশ্য স্বাভাবিক সময়ে অভিন্ন একটি নাম, একটি ইউনিফর্ম ও দৃশ্যমানতাই অন্যতম বড় কারণ ছিল তুলনামূলক বেশি অজনপ্রিয়তার পেছনে। অন্যের খারাপ কাজ যখন বহুধাবিভক্ত হয়ে কেন্দ্রীয় কোনো সমন্বিত বড় রূপ দাঁড় করাতে দেয়নি, তখনো পুলিশের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সীমাবদ্ধতা ও খারাপ কাজ প্রতিষ্ঠানের নামেই লিপিবদ্ধ হয়েছে যুগের পর যুগ। সেই অসুবিধাটিই এখন এই করোনাকালে পুলিশের জন্য বাড়তি সুযোগ এনে দিয়েছে। কিন্তু শঙ্কার করোনা-শ্বাসও রয়েছে চারপাশে। যা কিছু হুট করে আসে, তা আবার হুট করেই মিলিয়ে যায়। তাপ সঞ্চার ও বিকিরণের বিষয়টিও এমন। তাই খুব বেশি আনন্দিত ও আশ্বস্ত হওয়ারও কোনো কারণ নেই। বরং দুর্ভাবনার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে; রয়েছে একটি আশঙ্কাও।

সারা দিন রোদে পুড়ে খেটে খাওয়া একজন দরিদ্র কৃষককে আচমকা কাছে টেনে আপনার শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ কক্ষে এনে তাঁকে পোলাও-কোর্মা খাইয়ে হাতে এক হাজার টাকার দুটি কচকচে নোট ধরিয়ে বের করে দিলেই ল্যাঠা চুকে যায় না। আপনার আয়েশি মহলের ভেতর টেনে নিয়ে অপরিচিত আরাম ও স্বীকৃতির যে স্বাদ আপনি তাঁকে দিলেন, তা তাঁকে বরং ক্ষতিই করল। আপনার দান ও কৃপার বদৌলতে না তিনি আপনার মতো আয়েশি জীবন কিনতে পারবেন, না পারবেন পূর্ণ পরিতৃপ্তিতে তাঁর মোটা চাল, ডাল, নিরামিষ, ভর্তার মেন্যুকে আগের মতো ভালোবেসে তৃপ্তিতে খেতে। বাংলাদেশের নাগরিকদের কেউ কেউ ইউরোপ-আমেরিকার কোনো দেশে কিছুদিন থেকে দেশে ফিরে যে হা-পিত্যেশ করতে থাকেন, বিষয়টা অনেকটা সেই রকম। বাংলাদেশের পুলিশকে তাঁরা যেমন দেখে গিয়েছিলেন, ফিরে এসে তাঁরা তার চেয়েও খারাপ পান, যেমন পান দেশীয় অন্য অনেক সেবাকে। এর কারণ এই নয় যে পুলিশ এর মধ্যে আরও খারাপ হয়েছে। সমস্যাটা হলো, মাঠের কৃষকের এয়ার কন্ডিশন সিনড্রোম।

বাংলাদেশ পুলিশের অবস্থাটা যদি মাঠের কৃষকের এয়ার কন্ডিশন সিনড্রোমের মতো হয়, তবে বিষয়টা বেশ ভাবনারই। পুলিশের সদস্যরা যে বীরোচিত সম্মান ও স্বীকৃতি এই করোনাকালে মানুষের কাছ থেকে পেয়েছেন, করোনাকাল অতিক্রান্ত হওয়ার পরপরই সেই স্বীকৃতি ও ভালো লাগা-ভালোবাসায় ভাটার টান পড়তে পারে। কোনো ব্যক্তির কাছে আপনার কতটুকু প্রত্যাশা, তার ওপর নির্ভর করে সেই প্রত্যাশা পূরণে সেই ব্যক্তির ব্যর্থতায় তার ওপর আপনি কতটুকু সংক্ষুব্ধ হবেন। উদাহরণস্বরূপ, ঈদ-সালামির একটি গল্প ফেঁদে ফেলা যায়। ধরুন, একটি ছেলের ধারণা বা প্রত্যাশা ছিল তার বিদেশফেরত মেজ চাচা তাকে ৫০০ টাকা সালামি দেবেন। ছোট চাচা যিনি দেশে থাকেন এবং ছোট একটি চাকরি করেন, তাঁর কাছে ছেলেটির প্রত্যাশা কম। ভেবেছিল ছোট চাচা তাকে বড়জোর ১০০ টাকা সালামি দেবেন। বাস্তবে দেখা গেল বিদেশফেরত চাচা তাকে ১০০ টাকা সালামি দিয়েছেন। অন্যদিকে, তার ছোট চাচাও তাকে দিয়েছেন ১০০ টাকা। দুজনই সমান দিয়েছেন। কিন্তু প্রত্যাশার ভিন্নতার কারণে ছেলেটি তার মেজ চাচাকে কঞ্জুস ভাবতে শুরু করেছে। করোনাকাল পার হওয়ার পর পুলিশের অবস্থাটা আবার সেই বিদেশফেরত মেজো চাচার মতো না হয়।

করোনাকাল এখনো অতিক্রান্ত হয়নি। হয়তো আরও কিছু বা বহুদিন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। করোনার সঙ্গে সহাবস্থান হয়তো চলবে মাসের পর মাস কিংবা বছর-এক, দুই, তিন। করোনার সঙ্গে বসবাসের সময়কালটা যেহেতু অনির্দিষ্ট, সংগত কারণেই সুরক্ষা বজায় রেখে ধীরে ধীরে জনজীবন স্বাভাবিক হয়ে আসবে। পুলিশিংও ক্রমে ফিরে যাবে তার স্বাভাবিক চেহারায়। করোনা কনসেনট্রেটেড পুলিশিংয়ের সঙ্গে আবার আরও ব্যাপকভাবে যোগ হবে আইনশৃঙ্খলা ও জনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়মিত পুলিশিংয়ের স্বাভাবিক আয়োজন। করোনাকালে বর্ধিত প্রত্যাশার প্রসারিত হাত মানুষ মেলে ধরবে আমাদের সামনে। সেই হাত দুটিকে কীভাবে মানবিক সেবা ও সহযোগিতা দিয়ে করোনাকালের মতো পূর্ণ রাখা যায়, তা-ই হবে আসন্ন দিনগুলোয় বাংলাদেশ পুলিশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

লেখক: সহকারী মহাপরিদর্শক, পুলিশ সদর দপ্তর।

আপনার মন্তব্য লিখুন...