ঢাকা, সোমবার ১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪৩২, ০৯ জমাদিউস সানি ১৪৪৭ | এখন সময়:

Advertise@01680 34 27 34

জোড়া খুনের নিঃসংশয় আসামির নিঃশর্ত মুক্তি : বিচার না প্রহসন!


অনলাইন ডেস্কঃ

প্রকাশিত:   ০৯:১২ পিএম, বুধবার, ২২ ডিসেম্বর ২০২১   আপডেট:   ১০:১২ পিএম, বুধবার, ২২ ডিসেম্বর ২০২১  
জোড়া খুনের নিঃসংশয় আসামির নিঃশর্ত মুক্তি : বিচার না প্রহসন!
জোড়া খুনের নিঃসংশয় আসামির নিঃশর্ত মুক্তি : বিচার না প্রহসন!

গত ২০ নভেম্বর ২০২১ সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে টিভিতে খবর দেখে মন গম্ভীর হয়ে গেল।ফার্স্ট ডিগ্রি মার্ডার চার্জসহ ৫ প্রকার অভিযোগের সবকটা থেকে বর্তমানে ১৮ বছর বয়সী যুবক কাইল রিটেনহাইজ বেকসুর খালাস! দোষী প্রমাণিত হলে ১০-৬০ বছর তাকে কারাগারে থাকতে হতো। গত বছর সে দুজন নিরস্ত্র ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা ও অপর একজনকে গুরুতর জখম করেছিলো। প্রত্যক্ষ প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কিভাবে ঘটলো এই ঘটনা? তার আগে চলুন জেনে নেই পেছনের কাহিনি।

২৩ আগস্ট ২০২০, কেনোশা, উইসকনসিনে পুলিশের গুলিতে জ্যাকব ব্লেক নামে একজন কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান পংগু হয়ে যায়। ইতোমধ্যে পুলিশ কর্তৃক জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকান্ডে সমগ্র আমেরিকায় কৃষাঙ্গদের সম অধিকারের দাবিতে নাগরিকরা রাজপথ উত্তাল করে রেখেছিল। তা সত্ত্বেও পুলিশের গুলি/নির্যাতনে আমেরিকার বিভিন্ন স্থানে অনেক ভিন্ন বর্ণের মানুষ নিহত/নির্যাতিত হতে থাকে। কোথাও কোথাও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ এর ঘটনা ঘটতে থাকে। বলা মুশকিল এসব আত্মবিধ্বংসী কান্ড সমতাকামী ক্ল্যাক লাইভস ম্যাটার বা BLM মুভমেন্টের কর্মী-সমর্থকরা ঘটিয়েছে নাকি তাদের আদর্শিক প্রতিপক্ষ তথাকথিত শেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী উগ্র জাতীয়তাবাদী ডানপন্থী শিবিরের কাজ। আপনার যদি কোন ন্যায্য আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা থাকে তো আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন এটা কারা করে, কেন করে, কারা কি উদ্দেশ্যে করায়।

যাহোক, কেনোশায় 'ব্ল্যাক শুটিং' ঘি-তে আগুন ঢালার কাজ করে। দুদিন পর ২৫ আগস্ট ২০২০ রাজপথে পরিস্থিতি থমথমে হয়ে ওঠে যখন একদল আত্ম নিয়োজিত 'ব্যবসার রক্ষক' আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে আন্দোলনকারীদের মাঝে ত্রাস ছড়ানোর চেষ্টা চালাতে থাকে। এদেরি একজন কাইল রিটেনহাউজ তখন ১৭ বছর বয়সী কিশোর। যেসকল ফুটেজ ইন্টারনেটে পাওয়া যায়, সেগুলোর একটায় দেখা যায়-রিটেনহাউজ বলছে যে তার/তাদের হাতের অস্ত্র ' নন লিথাল'। আগেই বলেছি, রিটেনহাউজ সেই রাতে দুজন নিরস্ত্র ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা ও অপর একজনকে গুরুতর জখম করে। 

একটি ফুটেজ এ দেখা যায়, রিটেনহাউজ প্রথম যাকে খুন করে সে তার হাতে থাকা প্লাস্টিকের ব্যাগ রি'র দিকে ছুড়ে মারে। অবশ্যই এতে তার চুল পরিমাণ ক্ষতিও হয় নাই। কিন্ত স্প্লিট সেকেন্ড ব্যবধানে কাছাকাছি কোথাও কথিত(CNBC TV'র মতে) এক আন্দোলনকারী ফাকা গুলি ছোড়ে। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে এই ঘটনাও আদালতে রিটেনহাউজ এর পক্ষে যায়। আতংকগ্রস্ত হয়ে রিটেনহাউজ গুলি করে তার দিকে প্লাস্টিকের ব্যাগ ছুড়ে মারা ব্যক্তিটিকে হত্যা করে।(সশস্ত্র লোক আতংকগ্রস্ত হয়ে নিরস্ত্রকে গুলি করছে, করুণ বড়ই করূণ; নৈতিক ভিত্তি দুর্বল থাকলে যা হয় আর কি।) এরপর লোকজন তাকে ধাওয়া করলে সে ছোটার এক পর্যায়ে সড়কে পড়ে যায় এবং পুলিশের মতে ৪ রাউন্ড গুলি ছোড়ে এবং দুজনকে গুলিবিদ্ধ করে যাদের একজন মারা যায়। আহত ব্যক্তিটি রিটেনহাউজের এলোপাথাড়ি গুলি ছোড়া দেখে (আহত হওয়ার আগে) আত্মরক্ষার্থে পিস্তল বের করে তাকে কনফ্রন্ট করার চেষ্টা করে, কিন্তু রিটেনহাউজ বা অন্য কারো ক্ষতি করে নাই। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আদালতে এই ঘটনাও রিটেনহাউজের পক্ষে যায়। এরপর ছুটতে ছুটতে সে তার ঝোলানো অস্ত্রসহ পুলিশের গাড়ির সামনে চলে আসে। কিন্ত পুলিশ তাকে তখনই বা সে রাতে আটক বা গ্রেফতার করে না। রিটেনহাউজ এর এই তান্ডব চালানোর আগে রেকর্ড করা একটি ফুটেজে দেখতে ও শুনতে পারা যায়, পুলিশ আন্দোলনবিরোধী এসব অস্ত্রধারীদের হ্যান্ড মাইকে পিঠ চাপড়ে দিচ্ছে।

বলতে পারেন সমতার দাবিতে আন্দোলনরতরা কেন সহিংস হবে, অস্ত্র তুলে নিবে। হুম, বছরের পর বছর যদি একটি নির্দিষ্ট বর্ণের, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারকদের একই প্যাটার্ন মোতাবেক পুলিশি হত্যার শিকার ও কাঠামোগত ও সামাজিক বৈষম্যের শিকার হতে হয় এবং এই নৃশংসতা দিনকে দিন তীব্রতর ও ঘন ঘন হতে থাকে, সিস্টেম এর নিরসনে আন্তরিক না হয়; তবে দেয়ালে পিঠ থেকে গেলে মানুষ বিপদজনক হয়ে উঠবেই।

কাইল রিটেনহাউজ যাদের হত্যা করেছে, তার আইনজীবীরা তা আত্মরক্ষামূলক বলে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু এই তথাকথিত আত্মরক্ষামূলক গুলিবাজির প্রয়োজন দেখা দিলো তার অস্ত্র উঁচিয়ে আন্দোলনকারীদের মাঝে হম্বিতম্বি করতে থাকা উস্কানিমূলকতায় তাদের মাঝে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হবার কারণেই না? আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ নিহত-আহতরাই নেয়ার চেষ্টা করছিল। ধুরন্দর ক্রিমিনাল লইয়ারস দিনকে রাত আর কালোকে সাদা বানিয়ে দিলো। জুরি আর জাজ তা মেনে নিল। আইন অন্ধ। ন্যায়বিচার বন্ধ। হ্যা, একজন জুভেনাইল ক্রিমিনাল হিসেবে কিছুটা রেয়াত সে পেতে পারতো বৈকি, যেহেতু তখন সে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলো। তাই বলে এই কেলেংকারি!

রায় ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্পের ভাষ্য, "এটা যদি আত্মরক্ষার ঘটনা না হয় তবে কোনোটাই নয়।" গৎবাধা হাস্যস্কর অজ্ঞ ট্রাম্প। করোনাকালীন রেসিয়াল টেনশন যে এভাবে বেড়ে গেল তার মূল দায় তার-ই। নতুন প্রেসিডেন্ট যা বললেন তাতে বোঝা গেল- রায়ে অসন্তুষ্ট হলেও আদালতের রায়ের প্রতি তিনি শ্রদ্ধাশীল ও অন্যদেরও একই ভাবে তা মেনে নিতে আহবান জানিয়েছেন।

এবার বলে নিই জুরিদের কাজ কি। পক্ষে বিপক্ষে সমস্ত সাক্ষ্য -প্রমাণ উপস্থাপন শেষে কেউ অপরাধী নাকি নিরঅপরাধ সেই ব্যাপারে তাদের মত বিচারপতিকে জানানো। আর বিচারপতির কাজ রায় ঘোষণা করা। বলা হয়ে থাকে, জুরিদের সিদ্ধান্ত জাজকে প্রভাবিত করে না। জাজ সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে জুরিবোর্ড এর সুপারিশ উপেক্ষা করে রায় ঘোষণা করতে পারেন। কিন্তু এটা বুঝতে বিজ্ঞানী হতে হয় না যে ব্যাপারটা এমন নয়। জুরিদের সিদ্ধান্ত জাজকে খুবই প্রভাবিত করে এবং জুরিদের সিদ্ধান্ত এর বিরুদ্ধে গিয়ে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন রায় ঘোষণার সময় জাজ নেন না। কার্যত অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জাজ বা বিচারপতি একজন ঠুটো জগন্নাথ। লোকজন আদালত ভবনে উৎকন্ঠা ভরে অপেক্ষা করে জুরিবোর্ড কি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়। তারপর তারা আন্দাজ করে ফেলে জাজ কি রায় দিতে যাচ্ছে। উইসকনসিনের জুরি হ্যান্ড গাইড ঘেটে জুরি কারা, তারা কিভাবে নির্বাচিত হন, তাদের কাজ কি ইত্যাদি নিয়ে আমি কিছু পড়ালেখা করেছি । জুরি বোর্ডের সদস্যরা আমেরিকার সর্বত্র র‍্যান্ডমলি নির্বাচিত হন। তাদের না আছে কোনো লিগ্যাল এডুকেশন না আছে কোনো লিগ্যাল এক্সপেরিয়েন্স। কোনো কেস ট্রায়ালে ওঠার আগে নির্বাচিত জুরিদের বেসিক ব্রিফিং দেয়া হয়। জুরিদের কেউ চাকুরিজিবি, কেউ ব্যবসায়ী কেউ অন্য কিছু। যতোই তাদের শর্ট কোর্স ট্রেনিং দেয়া হোক, সব রকম পূর্বধারণা ঝেরে ফেলতে, নিরপেক্ষ হতে বলা হোক তারা স্রেফ সাধারণ নাগরিক, লিগাল প্রফেশনাল নয়। রিটেনহাউজের মতো রিটার্ডেড ক্রিমিনালদের বেবি ফেস আর ফ্যাচ ফ্যাচ কাঁদন কি তাদের প্রভাবিত করে না? যারা লিগ্যাল এক্সপার্ট নয় তাদের জুডিশিয়াল সিস্টেমে টেনে আনার মানে কি? একজন বিচারপতি-ই কি তার পেশাগত পড়াশোনা ও অভিজ্ঞতায় যথেষ্ট বৈদগ্ধ ও প্রজ্ঞা অর্জন করেন না যে তিনি নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে দায়িত্বশীল রায় ঘোষণা করতে পারেন? কাইল রিটেনহাউজ এর নিঃশর্ত মুক্তি ন্যায়বিচারের নামে এভাবেই প্রহসনে পরিণত হয়।

আমেরিকার একটি চাঞ্চল্যকর মামলার রায় এর প্রতিক্রিয়ায় এটি লিখেছেনঃ  নোয়েল মনোহার

মতামত থেকে আরও পড়ুন

আসামির নিঃশর্ত মুক্তি বিচার হত্যা প্রহসন মতামত কাইল রিটেনহাইজ

আপনার মন্তব্য লিখুন...