ঢাকা, শুক্রবার, ৯ জুন, ২০২৩  |  Friday, 9 June 2023  |  এখন সময়:

Advertise@01680 34 27 34

চিরনিদ্রায় টেলি সামাদ


অনলাইন ডেস্কঃ

প্রকাশিত:   ০৯:০৪ এএম, রবিবার, ৭ এপ্রিল ২০১৯    
চিরনিদ্রায় টেলি সামাদ
চিরনিদ্রায় টেলি সামাদ

মুন্সিগঞ্জের নয়াগাঁও এলাকায় বাবা-মায়ের কবরের পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন চলচ্চিত্রের শক্তিশালী ও জনপ্রিয় কৌতুক অভিনেতা টেলি সামাদ। আজ রোববার সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে গুণী এই অভিনেতার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী মুন্সিগঞ্জের পারিবারিক গোরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। 

বেলা সাড়ে তিনটায় টেলি সামাদের মরদেহ বহনকারী গাড়িটি ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ঢোকে। সেখানে তাঁর স্বজন ও ভক্তরা শেষবারের মতো এক নজর দেখতে আসেন। এ সময় অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন, স্মৃতিচারণা করেন।

মুন্সিগঞ্জে টেলি সামাদের শৈশব কাটানো বাড়িতে আর তাঁর স্বজনদের সঙ্গে কথা হয়। এ সময় তাঁর বড় বোন হোসনে আরা জানান, ২০১৮ সালে গ্রামের বাড়িতে শেষবারের মতো আসেন টেলি সামাদ। তিনি ছোটবেলা থেকেই ছিলেন মিশুক প্রকৃতির। সব সময় হাসি-তামাশায় সবাইকে মাতিয়ে রাখতেন। সবাইকে হাসিয়েছেন। কখনো কাউকে কটু কথা বলেননি। এমনকি পিঠেপিটি বোন হওয়া সত্ত্বেও এক দিনের জন্য ঝগড়া হয়নি।


শামসুল হক নামের এক প্রতিবেশী বলেন, ‘এলাকার যেকোনো ছোট অনুষ্ঠানে দাওয়াত করলেই টেলি সামাদ চলে আসতেন। এলাকায় এসে আশপাশের মানুষদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন। ছোটদের জন্য সব সময় পকেটভর্তি চকলেট রাখতেন। এলাকার চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিতেন। সারাক্ষণ গল্প করে মাতিয়ে রাখতেন।’

তাঁর বড় বোনের ছেলে আবু তাহের বলেন, ‘মামার নাম ছিল আবদুস সামাদ। টিভিতে অভিনয়ের কারণে তাঁর নাম হয়ে যায় টেলি সামাদ।’

তাঁর চাচাতো ভাই আবদুর রউফ বলেন, ‘টেলি সামাদ কিশোর অবস্থা থেকেই অভিনয় করেছেন। করেছেন মঞ্চনাটক। বিভিন্ন স্কুল-কলেজের অনুষ্ঠানে তাঁকে দেখা যেত। তাঁর রক্তের মধ্যেই অভিনয় মিশে ছিল। যখনই কথা বলতেন, মজা করে বলতেন। সবাইকে আনন্দ দিয়েছেন।’

বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে স্কুলমাঠে এই অভিনেতার শেষ ও পঞ্চম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় মোবাইলে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে টেলি সামাদের ছেলে সুমন সামাদ যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাবার জানাজা কার্যক্রম দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন।


এর আগে গতকাল শনিবার মাগরিবের নামাজের পর ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে টেলি সামাদের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এশার নামাজের পর পশ্চিম রাজাবাজার মসজিদে। তৃতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয় মগবাজারে দিলু রোডে শ্যালকের বাড়ির সামনের মসজিদে। আজ বেলা ১১টার আগেই টেলি সামাদের মরদেহ বহনকারী গাড়ি এসে পৌঁছায় এফডিসিতে। সেখানে শ্রদ্ধা জানান তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে হৃদ্‌রোগসহ নানা জটিল শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন টেলি সামাদ। তাঁকে প্রায়ই হাসপাতালে কাটাতে হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে আবার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত তাঁকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন অবস্থা আরও খারাপ হলে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় এই কৌতুক অভিনেতাকে লাইফ সাপোর্টে রাখার পরামর্শ দেন চিকিৎসক। গতকাল বেলা দেড়টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

১৯৪৫ সালের ৮ জানুয়ারি মুন্সিগঞ্জের নয়াগাঁও এলাকায় টেলি সামাদ জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৬ সালে পরিচালক নজরুল ইসলামের ‘কার বউ’ চলচ্চিত্রে তিনি প্রথম অভিনয় করেন। চার দশকে প্রায় ৬০০ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। টেলি সামাদ শেষ কাজ করেছেন ২০১৫ সালে অনিমেষ আইচের ‘জিরো ডিগ্রি’ ছবিতে। তবে তিনি দর্শকদের কাছে ‘পায়ে চলার পথ’ ছবির মাধ্যমে সর্বাধিক জনপ্রিয়তা পান। অভিনয়ের বাইরে অর্ধশতাধিক চলচ্চিত্রে তিনি গান গেয়েছেন। এ ছাড়া চিত্র শিল্পী হিসেবেও তার খ্যাতি ছিল।

গত শতকের সত্তরের দশক থেকে টেলি সামাদকে পর্দায় দেখেছেন দর্শকেরা। এযাবৎ অসংখ্য চলচ্চিত্র ও নাটকে নানা ধরনের চরিত্রে তাঁর দুর্দান্ত অভিনয় দর্শকের মনে দাগ কেটে আছে দারুণভাবে। নিজের অভিনয়শৈলী দিয়ে দর্শকদের বিনোদন ও হাসিতে সারাক্ষণ মাতিয়ে রাখেন টেলি সামাদ। একসময় কৌতুক অভিনেতা বললেই চলে আসত তাঁর নাম। সমানতালে অভিনয় করেছেন সিনেমায়, টেলিভিশনে। পেয়েছেন তুমুল জনপ্রিয়তা। টেলিসামাদ স্ত্রী, দুই মেয়ে, এক ছেলেসহ অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গেছেন। দুই মেয়ে সোহেলা সামাদ ও সায়মা সামাদ ঢাকায় এবং ছেলে সুমন সামাদ যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন।

মুন্সিগঞ্জে টেলি সামাদকে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানা, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মহিউদ্দিন, সরকারি হরগঙ্গা কলেজের অধ্যক্ষ আবদুল হাই তালুকদার, প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ অধ্যক্ষ মেজর মো. শরীফ উজ্জামানসহ জেলার বিভিন্ন এলাকার মানুষ।

আপনার মন্তব্য লিখুন...