ঢাকা, রবিবার, ২৮ মে, ২০২৩  |  Sunday, 28 May 2023  |  এখন সময়:

Advertise@01680 34 27 34

স্বর্ণের আংটি বিক্রি করে স্বপ্ন পূরণ


অনলাইন ডেস্কঃ

প্রকাশিত:   ০৮:০৩ এএম, শুক্রবার, ২২ মার্চ ২০১৯    
স্বর্ণের আংটি বিক্রি করে স্বপ্ন পূরণ
স্বর্ণের আংটি বিক্রি করে স্বপ্ন পূরণ

গাইবান্ধা সরকারি কলেজের ইংরেজি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ফরিদা সুলতানা সোনালী। নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে তিনি ৩৭তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।তার গল্প লিখেছেন- এম এম মুজাহিদ উদ্দীন


বর্ষাকালে কলাগাছের ভেলায় স্কুলে যেতাম


উত্তর জনপদের জেলা গাইবান্ধার সদর উপজেলার লক্ষীপুর ইউনিয়নে জন্ম তার। কৃষক বাবা আর গৃহিণী মায়ের সাত সন্তানের মধ্যে চতুর্থ। লেখাপড়ার হাতেখড়ি গ্রামের এক ব্র্যাক স্কুলে। তারপর ভর্তি হন এলাকায় লেংগাবাজার বিএস উচ্চ বিদ্যালয়ে। প্রতিদিন বাসা থেকে স্কুলে হেঁটে যেতে প্রায় ১ ঘণ্টা লাগত। বর্ষাকালে কলাগাছের ভেলায় করে স্কুলে যেতেন। দূরত্ব বেশি হলেও স্কুলে অনুপস্থিতির ঘটনা ছিল হাতেগোনা। যখন নবম শ্রেণিতে উঠেন এমন সময় ফরিদার বাবার হার্টের সমস্যা দেখা দেয়। ফলে বাবা কাজে পুরোপুরিভাবে অক্ষম হয়ে পড়েন। সাত ছেলে-মেয়েকে নিয়ে তার মা দিশেহারা হয়ে পড়েন। ফরিদার বাবার চিকিত্সা আর সংসার চালাতে গিয়ে এক সময় তার মা ও প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। ওই সময় তার এসএসসি পরীক্ষা। ২০০৬ সালে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে ৪.৯৪ পেয়ে এসএসসি পাস করেন। পাস করার পর স্কুলের বন্ধুরা যখন বিভিন্ন শহরে ভালো কলেজে পড়ার জন্য চলে যায়, তখন নীরবে চোখের জলই ছিল তার একমাত্র সান্ত্বনা।



জীবনের আরেক সংকটকালীন অধ্যায়:


ভর্তি হন এলাকার ধর্মপুর আব্দুল জব্বার ডিগ্রি কলেজে। ২০০৭ সালে বিজ্ঞান বিভাগের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী। মা-বাবার অসুস্থতা চরমপর্যায়ে, তখন লেখাপড়া বন্ধের উপক্রম। ঠিক তখনই বিয়ের প্রস্তাব। ছেলে লেখাপড়ার দায়িত্ব নেবেন শুনেই বিয়েতে রাজি হয়ে গেলেন। শুরু হলো জীবনের আরেক সংকটকালীন অধ্যায়। যা ভেবেছিলেন পরিবেশ পুরোপুরি তার বিপরীতে যাওয়া শুরু হলো। যৌথ পরিবারে বাবা-মায়ের সিদ্ধান্তের কাছে পরাজিত হলো তার স্বামী। স্বামী নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করলেও মানসিক সাপোর্ট দিয়েছিল। বিয়ের কিছু দিন পর বাবা মারা যান। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। একবেলা কাজ না করলে খাবারটুকু মুখে উঠতো না। কখনো না খেয়েই কাটিয়ে দিয়েছেন। আবার কখনো পাশের বাড়ির ভাবি রাতের অন্ধকারে খাবার দিয়ে যেত, তা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তেন। তার অপরাধ লেখাপড়া করা! তারপরও ভাবতেন তাকে যেতে হবে অনেক দূর। বাধা পেরিয়ে তিনি জিপিএ ৪.৪০ নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন ।



স্বর্ণের আংটি বিক্রি ও স্বপ্ন পূরণ:


অনার্সে ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হওয়ার পর নিজের স্বর্ণের আংটি বিক্রি করে গাইবান্ধার এক মেসে ওঠেন। অনার্স দ্বিতীয় বর্ষ থেকেই বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু করেন। তখন থেকেই একাডেমিক পড়ার পাশাপাশি সাধারণ জ্ঞান, বাংলা ও গণিতের বিভিন্ন রেফারেন্স বই সংগ্রহ করে পড়তে থাকেন। ৩৫তম বিসিএস প্রিলিতে উত্তীর্ণ হন। হঠাৎ নতুন প্রাণের অস্তিত্ব টের পেলেন। ফলে কখনো বসে, কখনো দাঁড়িয়ে লিখে পরীক্ষা শেষ করেছেন। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে এবার নতুন আশঙ্কা ভাইভা দিতে পারবেন কি না? সৌভাগ্যবশত নতুন সন্তান আসে ৪ ফেব্রুয়ারি আর ভাইভা পড়ে ৩ মার্চ। সিজারের পর এতদূর জার্নি করা ডাক্তারের নিষেধ ছিল। তা সত্ত্বেও ভাইভায় অংশগ্রহণ করেন। ফলাফল ননক্যাডার। প্রত্যেকটা লিখিত পরীক্ষায় নিজের নতুন কৌশল প্রয়োগ করেছেন। ইতোমধ্যে ৩৫তম ননক্যাডার থেকে ‘সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা’ হিসেবে সিলেট কমিশনারেটে জয়েন করেন। ৩৭তম ভাইভা দেয়ার পর প্রত্যাশা আরো বেড়ে যায়। অবশেষে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন...