ঢাকা, রবিবার ২৪ মে ২০২৬, ১০ জৈষ্ঠ্য ১৪৩৩, ০৬ জিলহজ ১৪৪৭ | এখন সময়:

Advertise@01680 34 27 34

টিকা রাজনীতি ও টিকা জাতীয়তাবাদ


অনলাইন ডেস্কঃ

প্রকাশিত:   ০২:০৮ এএম, রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২০   আপডেট:   ০২:০৮ এএম, রবিবার, ২৩ আগস্ট ২০২০  
টিকা রাজনীতি ও টিকা জাতীয়তাবাদ
টিকা রাজনীতি ও টিকা জাতীয়তাবাদ

জাতীয়তাবাদ নিয়ে আলোচনা হালে আবার ফিরে আসছে। করোনার সময় টিকা নিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রের দৌড়ঝাঁপকে অনেকেই টিকা জাতীয়তাবাদ বলে অভিহিত করেছেন। করোনা সংক্রমণ বিস্তারের পরপরই বিভিন্ন দেশ টিকা আবিষ্কার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশ্বে যেভাবে দুর্দমনীয়ভাবে করোনার প্রকোপ এখনো চলছে, তার থেকে মুক্তির জন্য টিকার বিকল্প নেই। সবাই টিকা আবিষ্কারের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। অধীর আগ্রহ নিয়ে মানুষ টিকার জন্য অপেক্ষা করছে। বিষয়টা এ পর্যন্ত এ রকম থাকলে ঠিক ছিল। টিকা আবিষ্কার ও এর প্রাপ্তি এত সহজ বিষয় না। এর সঙ্গে অর্থ ও রাজনীতি প্রবলভাবে জড়িত।

প্রশ্ন হচ্ছে টিকা সবাই পাবে কি না? শতাধিক টিকা নিয়ে এখন গবষণা চলছে। কিছু টিকা একদম শেষ পর্যায়ে আছে। এর মধ্যেই রাশিয়া একেবারেই হুট করে টিকার অনুমোদন দিয়ে দেয়। এই টিকা নিয়ে আবার নানা ধরনের মতামত আছে। এটা যেহেতু রাশিয়ার টিকা। তাই যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করেছে এই টিকা অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ বৈজ্ঞানিক নিয়মনীতি অনুসরণ করা হয়নি। এটা মার্কিনপন্থীদের জন্য  ইশারা। মানে যারা যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকে, তারা মনে হচ্ছে এ টিকা ব্যবহার করবে না। ওদিকে চীনের টিকাও বাজারে আসবে আসবে করছে। চীনা কোম্পানি সিনোভ্যাকের টিকার তৃতীয় পর্যায়ে পরীক্ষা চলছে বা শিগগিরই শুরু হবে। এখন যদি চীনের টিকা বাজারে চলে আসে তবে যুক্তরাষ্ট্রের সব মাঠে মারা যাবে। যুক্তরাষ্ট্র তো নিজস্ব ওষুধ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে বসে আছে টিকার জন্য। ভাবখানা অনেকটাই এ রকম, সব টিকা যুক্তরাষ্ট্রের একারই লাগবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে টিকার রাজনীতিতে রাশিয়া ও চীন অনেকটা এগিয়ে। অতএব চীন ও রাশিয়ার টিকা ঠেকাতে মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা।

কথা ছিল, বাংলাদেশে চীনের টিকার ট্রায়াল হবে। কিন্তু সে প্রক্রিয়া অনেকটা এগিয়ে থমকে গেছে। কারণ হিসেবে অনেকেই দেখছেন প্রতিবেশী দেশ ভারতের আগ্রহকে। ভারতও বাংলাদেশকে টিকা দিতে আগ্রহী। কিন্তু ভারত টিকা দেবে কোত্থেকে। প্রথমত, অক্সফোর্ডের টিকা পুনে সিরাম ইনস্টিটিউট উৎপাদন করবে। সেই টিকা ভারত আমাদের দিতে পারে। যদি অক্সফোর্ডের টিকা অনুমোদন না পায় তবে অন্য কোনো জায়গা থেকে এনে দেবে। এই যে বাংলাদেশ সরাসরি চীনের কাছ থেকে না নিয়ে ভারতকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে অন্য দেশের টিকা ব্যবহার করবে, এখানেই টিকা রাজনীতি বা টিকা জাতীয়তাবাদের মূল বিষয় জড়িয়ে আছে। ভারত চাইছে টিকার জন্যও বাংলাদেশ তাদের ওপর নির্ভরশীল থাকুক।

চীন, রাশিয়া বা ভারত সবাই তো বিভিন্ন দেশকে টিকা দিতে চাইছে। এখানে একধরনের আন্তর্জাতিকতাবাদ লক্ষ করা যায়। তাহলে জাতীয়তাবাদ এল কোত্থেকে? জাতীয়বাদ কেবল রাষ্ট্রের সীমার মধ্যেই আটকে থাকে না। জাতীয়তাবাদের অহম, গরিমা কখনো কখনো সীমান্ত অতিক্রম করে বাইরে যায় বটে। টিকার রাজনীতিতে রাষ্ট্রের সেই জাতীয়তাবাদী অহম ও গরিমা প্রতিষ্ঠার প্রকাশ দেখা যাচ্ছে।

করোনার আঘাতের আগপর্যন্ত বিশ্বে মহামারি মোকাবিলায় একধরনের স্বাস্থ্য কূটনীতি ছিল। ওই কূটনীতিতে নিজের রক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক, মানবাধিকার ও সবার জন্য মানবিক সাহায্যের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। করোনার সংকটে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়টি তেমন প্রতিফলিত হচ্ছে না। বরং দেশগুলো অধিকতর জাতীয়তাবাদী আচরণ করছে। টিকা জাতীয়তাবাদ প্রমাণ করে যে স্বাস্থ্য খাতের সহযোগিতা আরও বাড়াতে হবে। কারণ করোনা সংকেটর সময় টিকা নিয়ে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাস্তবতার চেয়ে বাকোয়াজি বেশি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ৩১ জুলাই ওষুধ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে টিকা সংগ্রহের জন্য চুক্তির বিষয়টি ঘোষণা করে। চীন, ভারত, যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপী অন্য দেশগুলোও একই নীতি গ্রহণ করেছে। টিকা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে গিয়ে দেশগুলো করোনা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। বরং অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অকার্যকর জাতীয়তাবাদী নীতি বরং বিজ্ঞান ও রাজনীতির মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি করেছে। বিজ্ঞান ও স্বাস্থ্য কূটনীতি এই করোনার মহামারিকালে যা আর্জন করতে পারত, সেই সম্ভাবনাকে তিরোহিত করছে টিকা জাতীয়তাবাদ।

ঐতিহাসিকভাবেই যেকোনো রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটলে ওষুধ সহজলভ্য করতে স্বাস্থ্য কূটনীতি সংকটে পড়ে যায়। ২০০৯ সালে সোয়াইন ফ্লুর বিস্তারের সময় একই অভিজ্ঞতা আমাদের হয়েছে। উন্নত দেশের জন্য ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত হওয়ার পরই অনুন্নত দেশের কপালে ওষুধ জোটে। গুটিবসন্ত, পোলিও বা এইচআইভির ওষুধ সরবরাহের ক্ষেত্রে একই অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যায়। তবে এর মধ্যে চীন ও ভারত এই অবস্থান পরিবর্তনের জন্য নিজস্ব উদ্ভাবনী শক্তি ও ওষুধশিল্পকে ব্যবহার করেছে। কিন্তু অবস্থা খুব বেশি পরিবর্তিত হয়নি।

বরং ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন নিয়ে এসেছে করোনার টিকা জাতীয়তাবাদ। ভূ-রাজনৈতিক হিসাব–নিকাশ টিকা প্রাপ্তি ও সরবরাহে গুরুত্বতর প্রভাব ফেলেছ। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও ভারত করোনা মহামারিকে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের একটি ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। দ্রুত টিকার আবিষ্কার ক্ষমতার রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান সংহত করার জন্য বিশ্ব মোড়লেরা ব্যবহার করছে। অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের জন্যও টিকার আবিষ্কার জরুরি হয়ে পড়েছে। টিকা জাতীয়বাদের বৈশিষ্ট্য পরিষ্কার। প্রথমত, নিজের দেশের জন্য টিকা মুজত করা। এরপর কে টিকা পাবে, কোত্থেকে পাবে সেটাই ঠিক করে দেবে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো। সোয়াইন ফ্লুর মহামারির পর অনুন্নত দেশগুলো রোগব্যাধি ও এর নমুনাকে সার্বভৌম বলে ঘোষণা দাবি করেছিল। এ কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১২ সালের ফ্রেমওয়ার্কে এ রকম একটি ধারণা যুক্তও করা হয়েছিল। কিন্তু টিকা জাতীয়বাদের কাছে এই সার্বভৌমত্ব ম্লান হয়ে গেছে। চাইলেই সবাই চীন ও রাশিয়ার থেকে টিকা নিতে পারছে না।

ড. মারুফ মল্লিক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আপনার মন্তব্য লিখুন...